“ঘরে বসেই অল্প পুঁজিতে শুরু করুন লাভজনক ব্যবসা। অল্প দিনেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন চটকদার বিজ্ঞাপনের লোভনীয় ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষ ও বেকার তরুণ-যুবকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছে ‘জান্নাত ফুড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্বল্প পুঁজিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যারা তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন, তারাই পড়ছেন চরম আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক ভোগান্তিতে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত এই প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সক্রিয় রয়েছে। যার মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের শাহিন নামের এক ব্যক্তির নাম। চক্রটি মূলত দেশীয় মিষ্টি ও শুকনো খাবার—যেমন নারকেল ও তিলের নাড়ু, সন্দেশ, মুখরোচক আচার এবং বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় খাদ্যসামগ্রী পাইকারি সরবরাহের নামে এই জালিয়াতির জাল বিস্তার করেছে।
অভিযোগ ও অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, বেকার যুবক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টার্গেট করে ফেসবুক পেজে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে জান্নাত ফুড। বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়, নামমাত্র পুঁজিতে তাদের কাছ থেকে পাইকারি মূল্যে নাড়ু, সন্দেশ ও আচার কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে মাসে মোটা অঙ্কের লাভ করা সম্ভব। তাদের এমন মনভোলানো কথায় আকৃষ্ট হয়ে যখন কোনো তরুণ ব্যবসা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন শুরু হয় মূল খেলা। চক্রটি ক্রেতাকে আশ্বস্ত করে যে পণ্য হাতে পাওয়ার পরই বাকি টাকা দেওয়া যাবে, তবে প্রাথমিক বুকিং বা পণ্য পাঠানোর খরচ হিসেবে আগে বিকাশে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠাতে হবে। সরল বিশ্বাসে ভুক্তভোগীরা অগ্রিম সেই টাকা পাঠিয়ে দেন।
টাকা পাওয়ার পর জান্নাত ফুডের পক্ষ থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোও হয়। তবে কুরিয়ার থেকে পার্সেল ছাড়িয়ে নেওয়ার পর উন্মোচিত হয় তাদের আসল রূপ। কার্টন খুলতেই দেখা যায়—পণ্যগুলোর কোনোটিরই মেয়াদ নেই, বহু আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ছত্রাক ধরা, দুর্গন্ধযুক্ত এবং খাওয়ার সম্পূর্ণ অনুপযোগী নাড়ু ও সন্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু কুরিয়ার সার্ভিসে পণ্য খুলে দেখে টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না এবং কুরিয়ারের শর্ত অনুযায়ী আগেই পুরো পার্সেল রিসিভ করতে হয়, ফলে ক্রেতার আর টাকা ফেরতের কোনো সুযোগ থাকে না।
পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য হাতে পেয়ে ভুক্তভোগীরা যখন জান্নাত ফুডের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করেন, তখন তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় আরেকটি ফাঁদ পাতে। চক্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, “ভুলবশত এমনটি হয়েছে। আপনারা নতুন আরেকটি পণ্যের অর্ডার দিন, নতুন চালানের সঙ্গে আমরা আগের নষ্ট মালগুলো পরিবর্তন (রিপ্লেস) করে ভালো মাল পাঠিয়ে দেব।” তবে এই নতুন চালানের জন্যও আবারও অগ্রিম টাকা বিকাশে পাঠানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী যদি তাদের এই প্রস্তাব মেনে না নেন কিংবা টাকা ফেরত চেয়ে চাপ প্রয়োগ করেন, তবে মুহূর্তের মধ্যেই তার ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দেওয়া হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ব্লক করে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চক্রটি।
ভুক্তভোগী এক তরুণ উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি জমানো কিছু টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলাম। জান্নাত ফুডের পেজে নাড়ু ও সন্দেশের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে কুরিয়ারে মাল পাঠায়। কার্টন খুলে দেখি সব খাবার পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত, খাওয়ার কোনো উপায় নেই। অভিযোগ জানালে তারা উল্টো আরও টাকা দিয়ে নতুন অর্ডার করতে বলে। আমি টাকা ফেরত চাইলে তারা আমার নম্বর ব্লক করে দেয়।” অনুসন্ধানে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদন বা নিজস্ব কোনো স্থায়ী কারখানা নেই। নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শাহিন নামের ওই ব্যক্তির নেতৃত্বে চক্রটি কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছাড়াই কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব বিষাক্ত ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে শুধু তরুণরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, এই পচা খাবার কোনোভাবে বাজারে চলে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির অভাব এবং কুরিয়ার সার্ভিসের নিয়মকানুনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের প্রতারক চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অবিলম্বে ‘জান্নাত ফুড’ ও এর পেছনে থাকা হোতা শাহিনকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে কোনো চটকদার অনলাইন বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হয়ে অগ্রিম লেনদেন না করার এবং প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে ব্যবসা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: মহিউদ্দিন আহম্মেদ
সহ সম্পাদক : আছিয়া উদ্দিন লীনা
সম্পাদকীয় কার্যালয় :
৬৯৮/এ, উত্তর কাফরুল
মিরপুর, ঢাকা-১২১৬।
Copyright @2023 Tnews24