
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগের চিত্রে
বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এই যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ও প্রবেশদ্বার হিসেবে
পরিচিত শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও শত
শত যানবাহন এই পথ দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করে কিংবা রাজধানীতে থেকে দক্ষিণাঞ্চলের
বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। তবে যোগাযোগব্যবস্থার এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির বিপরীতে নাওডোবা
বাসস্ট্যান্ড এখন এক গভীর ক্ষোভ ও অস্বস্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পরিবহনমালিক, চালক ও সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের
কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই বাসস্ট্যান্ডটি।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, স্থানীয় ‘বাবু-অপু সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে
নাওডোবা বাসস্ট্যান্ড ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে সংগঠিত ও বেপরোয়া চাঁদাবাজি। পদ্মা
সেতুর টোল প্লাজার ঠিক আগেই গড়ে ওঠা এই চক্রের কারণে চরম আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক
ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বাস মালিক, চালক, হেলপার ও সাধারণ যাত্রীরা। কোনো ধরনের
নিয়মরীতির তোয়াক্কা না করে দিনদুপুরে প্রকাশ্যেই এই অর্থ তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ
রয়েছে।
চাঁদাবাজির দুই কৌশল: ‘জিপি’ ও ‘মাথাপিছু’ হিসেব সম্প্রতি সরেজমিনে নাওডোবা
বাসস্ট্যান্ড, কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকা ঘুরে এবং পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন
পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এই চাঁদাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। জানা যায়,
মূলত দুটি ভিন্ন কৌশলে নিয়মিতভাবে এই অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও নিয়মিত মাধ্যমটি হলো ‘জিপি’ বা ‘গেটলক পাস’। অভিযোগ
অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী কিংবা ঢাকা
থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার প্রতিটি বাস নাওডোবা বাসস্ট্যান্ড অতিক্রম করার সময়
নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয়। বাসভেদে এই ‘জিপি’ বাবদ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত
বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয়। স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়াটির
মূল নিয়ন্ত্রণ করেন বাবু শেখ নামের এক ব্যক্তি এবং তাঁর অনুসারীরা।
চাঁদাবাজির দ্বিতীয় কৌশলটি আরও অভিনব ও বেপরোয়া। বরিশাল, খুলনা, মাদারীপুর ও
পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকাগামী যেসব বাসে আসন খালি থাকে, নাওডোবা মোড়ে
পৌঁছালে সেই বাসগুলোতে যাত্রী ওঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই স্ট্যান্ডে যাত্রী তোলার
ক্ষেত্রে চালক বা হেলপারদের নিজস্ব কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সিন্ডিকেটের নিয়োজিত
লোকজন বাসে কতজন নতুন যাত্রী উঠলেন, তা গুণে দেখেন। এরপর প্রতি যাত্রী বাবদ চালক ও
হেলপারের কাছ থেকে ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত জোরপূর্বক আদায় করা হয়।
দিনশেষে এই অঙ্কের পরিমাণ দাঁড়ায় লাখ লাখ টাকায়। মাঠপর্যায়ে বাবু ও অপুর অনুসারীরা
সার্বক্ষণিক পাহারা বসিয়ে এই টাকা সংগ্রহ করেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
না দিলে মারধর ও যাত্রী তোলায় নিষেধাজ্ঞা বাসচালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা
গেছে, এই টাকা দেওয়া না-দেওয়া কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং তা পুরোপুরি বাধ্যতামূলক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দূরপাল্লার পরিবহনের চালক বলেন, “নাওডোবা, কাজিরহাট
কিংবা টিএনটি মোড়ে ওদের টাকা না দিলে গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়। যাত্রীদের সামনেই
হেলপারের কলার চেপে ধরা হয়, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। চাঁদা না দিলে কোনো বাসে
লোকাল যাত্রী তুলতে দেওয়া হয় না।”
একই অভিযোগ করেন খুলনার একটি পরিবহন কোম্পানির মালিক। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন,
“পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আমাদের সময় ও দূরত্ব কমেছে ঠিকই, কিন্তু নাওডোবার মতো
জায়গায় এমন চাঁদাবাজি আমাদের পুরো ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে
এবং গাড়ি ভাঙচুর কিংবা শ্রমিকদের ওপর হামলার ভয়ে বাধ্য হয়েই প্রতিদিন বাড়তি টাকা
গুনতে হচ্ছে। এই যে অতিরিক্ত চাঁদার টাকা, এর প্রভাব তো সরাসরি যাত্রীদের ওপরই পড়ে।
ভাড়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের পকেট থেকেই এই টাকাটা যায়।”
পরিবহন মালিকদের মতে, প্রবেশমুখের এই অবৈধ অর্থ আদায় অবিলম্বে বন্ধ করা গেলে
পরিচালন ব্যয় কমত এবং যাত্রীদেরও কিছুটা কম ভাড়ায় সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।
আগেও ছিল আলোচনা, বদলায়নি চিত্র নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডের এই চাঁদাবাজির চিত্র
একেবারেই নতুন নয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগেও নাওডোবা এলাকায় চাঁদাবাজি ও
যাত্রী হয়রানি নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একটি বেসরকারি
টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নাওডোবা মোড়ে যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও তা
নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে হাতাহাতির দৃশ্যও প্রকাশ্যে প্রচারিত হয়েছিল।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর প্রশাসনের
কিছুটা তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। কিছুদিনের জন্য চাঁদাবাজির তৎপরতা বন্ধ কিংবা গা-ঢাকা
দিয়ে চললেও পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতেই আবার আগের রূপে ফিরে আসে সিন্ডিকেটটি। আগের
চেয়ে আরও বেশি সংগঠিত হয়ে তারা পরিবহন খাত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় শুরু করে।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রভাবের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই চাঁদাবাজির পেছনে
রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির সমন্বয়। নাওডোবা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি
সারোয়ার হোসেন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন,
“বাবু শেখের আদি বাড়ি নোয়াখালী অঞ্চলে হলেও তিনি নাওডোবার স্থানীয় প্রভাবশালী অপু
ব্যাপারীর আত্মীয়। অপু ব্যাপারীর প্রভাব ও প্রশ্রয়কে কাজে লাগিয়ে বাবু
বাসস্ট্যান্ডে নিজের একটি নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তুলেছেন।”
সারোয়ার হোসেন আরও অভিযোগ করেন, “গত বছরের ৫ আগস্টের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র
আন্দোলনের সময় সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায়ও এদের সক্রিয় সংশ্লিষ্টতার
অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এই চক্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা কেবল
নিজেদের কৌশল বদলেছে। এখন তারা নতুন করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির
ছত্রচ্ছায়ায় ঢুকে পড়েছে এবং বাসস্ট্যান্ডের পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে জিম্মি করে আগের
মতোই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে।”
অভিযুক্তের বক্তব্য তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের
সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাবু শেখ। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা
হলে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা চাঁদাবাজির সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট
ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডে কোনো চাঁদাবাজি করি না। আমি মূলত
কয়েকটি বাস কাউন্টারের দায়িত্ব পালন করি। আমার অধীনস্থ লোকজনও নিয়ম মেনেই
কাউন্টারের দায়িত্ব পালন করে থাকে। একটি পক্ষ ব্যবসায়িক হিংসা থেকে আমাকে
রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।”
ছাত্র আন্দোলনের সময় তাঁর হকিস্টিক হাতে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে
পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাবু শেখ দাবি করেন, “ওই ছবিটি আন্দোলনের সময় হামলার কোনো
ছবি নয়। সেটি একটি খেলার মাঠে যাওয়ার সময় তোলা ছবি ছিল, যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়িয়ে
দেওয়া হয়েছে। আর বিগত নির্বাচনের সময় আমাদের জোর করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোস্টার
হাতে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির
সঙ্গে যুক্ত।”
প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য পদ্মা সেতুর মতো দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রবেশমুখে দিনের পর দিন এমন সংগঠিত চাঁদাবাজির অভিযোগ
প্রসঙ্গে প্রশাসনের টনক নড়েছে। জানতে চাইলে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
(ইউএনও) আল ইমরান বলেন, “নাওডোবা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজির
অভিযোগকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সেখানে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কি
না বা সাধারণ চালক-যাত্রীদের জিম্মি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিললেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
অন্যদিকে শরীয়তপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো.
তানভীর হোসেন বলেন, “নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডে পরিবহন থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের
বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তবে বিষয়টি
নিয়ে মুখে মুখে নানা অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে এই বিষয়ে নিজস্ব গোয়েন্দা
অনুসন্ধান শুরু করেছে। যাত্রী বা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ
তৎপর রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনুসন্ধানে প্রমাণ পেলেই দোষীদের বিরুদ্ধে আইন
অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্বস্তির অপেক্ষায় যাত্রী ও পরিবহন খাত পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যেখানে
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে
প্রবেশমুখেই স্থানীয় সিন্ডিকেটের এমন অপতৎপরতা পুরো পরিবহন খাতকে প্রশ্নের মুখে
ফেলেছে। স্থানীয় সচেতন মহল এবং নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের প্রশ্ন—প্রশাসনের
নজরদারির ভেতরে থেকেও কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে নাওডোবায় এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলতে
পারে?
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, লোকদেখানো তদন্ত নয়, বরং স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বা
নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডকে পুরোপুরি
চাঁদাবাজমুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সিন্ডিকেটের শক্তির চেয়ে আইনের শাসন
দৃশ্যমান না হলে এই ভোগান্তি থেকে নিস্তার মিলবে না বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: মহিউদ্দিন আহম্মেদ
সহ সম্পাদক : আছিয়া উদ্দিন লীনা
সম্পাদকীয় কার্যালয় :
৬৯৮/এ, উত্তর কাফরুল
মিরপুর, ঢাকা-১২১৬।
Copyright @2023 Tnews24