কিংসটাউনের আর্নোস ভেলে স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ১৮ হাজার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে স্টেডিয়ামের গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। এতো এতো ক্যারিবীয় দর্শকের মাঝে বাংলাদেশি দর্শক ছিলেন কেবল দু’জন (আসলে একজন)। নিউইয়র্ক থেকে শাখওয়াত নামের এক ক্রিকেটপ্রেমী সেন্ট ভিনসেন্টে খেলা দেখতে এসেছেন। তিনিই মূলত দর্শক হিসেবে গ্যালারিতে ছিলেন। এর বাইরে বাংলাদেশের আইকনিক সমর্থক টাইগার শোয়েব গ্যালারিতে গলা ফাটিয়েছেন। ভিনদেশি বেশ কয়েকজন সমর্থক বাংলাদেশের জন্য গলা ফাটালেও বাকিরা ছিলেন স্বাগতিক দেশের-ই। এতো এতো সমর্থকদের সামনে আজ উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা। বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে ৭ রানের রুদ্ধশ্বাস জয়।
১৮ হাজার সমর্থকের চিৎকারের মাঝে বাংলাদেশি দুই সমর্থক শাখওয়াত ও শোয়েবের চিৎকার ২২ গজ অব্দি পৌঁছানো কঠিনই ছিল। তবু তারা গলা ফাটিয়েছে। একজন সুদূর বাংলাদেশ থেকে গেছেন, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তাদের কাউকেই হতাশ হতে হয়নি। ওয়ানডেতে ধবল ধোলাই হওয়া বাংলাদেশ দাপট দেখিয়েই প্রথম টি-টোয়েন্টি জিতে নিয়েছে। শেখ মেহেদী হাসানের ঘূর্ণি জাদুতে ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপ শুরুতেই ভেঙে পড়ে। সেখান থেকে ম্যাচ অনেকটাই বের করে ফেলেছিলেন অধিনায়ক রোভম্যান পাওয়েল। কিন্তু হাসান মাহমুদের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে শেষ পর্যন্ত দম বন্ধ করা জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ।
মামুলি এই লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ দল ক্যারিবিয়দের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি জিতবে- ম্যাচ শেষের আগে এটি কেউ কল্পনাতেও আনেনি। যে ফরম্যাটে বাংলাদেশ শক্তিশালী, সেই ওয়ানডেতে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ধবল ধোলাই হতে হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন ফরম্যাটের শুরুটা হয়েছে দারুণভাবে। গ্যালারিতে থাকা দুই বাংলাদেশি সমর্থক এমন কিছু চিন্তাও করেননি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে খেলা দেখতে আসা সাখওয়াত জানালেন নিজের অনুভূতির কথা, ‘দারুণ লাগছে, গ্যালারিতে আমিই কেবল ছিলাম। দেশের জন্য গলা ফাটিয়েছে। বিজয় দিবসের দিনে এমন জয়। এতো খুশি আমি আর কখনোই হয়েছি কিনা মনে পড়ছে না।’
বাংলাদেশের খেলা মানেই গ্যালারিতে টাইগার শোয়েব। বাংলাদেশের আইকনিক সাপোর্টার তিনি। বাংলাদেশ এই ম্যাচ জিতবে শুরু থেকেই বিশ্বাস ছিল তার, ‘গ্যালারিতে পাওয়েল যখন ছক্কা মারছিল, আমি তবু বাংলাদেশ বাংলাদেশ করছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল এই ম্যাচ বাংলাদেশ জিতবেই। কেবল একটা উইকেট দরকার ছিল। শেখ মেহেদী আর হাসান মাহমুদকে ধন্যবাদ। বাংলাদেশকে এমন একটা জয় উপহার দেওয়ার জন্য।’
৪ ওভারের স্পেলে ১৩ রান খরচ করে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন শেখ মেহেদী হাসান। ১৪৮ রান তাড়া করতে নেমে ৬১ রান তুলতেই স্বাগতিকরা হারিয়ে ফেলে সাত উইকেট। এরপরই ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু রোভম্যান পাওয়েল যেন পণ করে নেমেছিলেন। কোনওভাবেই বাংলাদেশ দলকে জিততে দেবেন না। নিজের পাওয়ার হিটিংয়ের সদ্ব্যবহার করে ১৯তম ওভারে দলের স্কোর নিয়ে যান ১৩৮ রানে। শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ১০ রানের। কিন্তু হাসান মাহমুদের দারুন বোলিংয়ে পাওয়েল ও আলজেরি জোসেফ পেরে উঠেননি। তাতেই ৭ রানের শ্বাসরুদ্ধকর জয় পেয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। কিন্সটাউনের এই জয়ের আনন্দ পৌঁছৈ গেছে ১৪ হাজার ৮৮৯ কি.মি. দূরের বাংলাদেশেও।
এর আগে টস হেরে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পাওয়া বাংলাদেশ ম্যাচের শুরু থেকেই চোখে সর্ষেফুল দেখতে থাকে। তৃতীয় ওভারের তৃতীয় ও চতুর্থ বলে আকিল হোসেন নিয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম ও লিটন দাসের উইকেট। তানজিদ তামিম ১১ বলে করেছেন ৬ রান। মেরেছেন ১টি চার। কিন্তু অধিনায়ক লিটন মেরেছেন গোল্ডেন ডাক। লম্বা সময় ধরেই রান খরায় ভুগছেন তিনি। ওয়ানডে ফরম্যাটের ব্যর্থতা টেনে এসেছেন টি-টোয়েন্টি সিরিজেও।
পাওয়ার প্লেতে দুই টপ অর্ডার ব্যাটারের উইকেট হারানোর পাশাপাশি সফরকারীরা হারায় আফিফ হোসেনর উইকেট। ১১ বলে ২ চারে ৮ রান করেন আফিফ। ৩০ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন সৌম্য সরকার ও জাকের আলী অনিক। দুইজন ৫৩ রানের জুটি গড়েন। ১৩তম ওভারের চতুর্থ বলে জাকেরকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন রোমারিও শেফার্ড। ২৭ বলে ১ চার ও ২ ছক্কায় জাকের খেলেন ২৭ রানের ইনিংস। এরপর ১৫তম ওভারের শেষ বলে সৌম্যকে অসাধারণ এক স্লোয়ারে বোল্ড করেন ওবেড ম্যাককয়। ওপেনিংয়ে নেমে ৩২ বলে ২ চার ও ৩ ছক্কায় সৌম্য করেছেন ৪৩ রান। বাঁহাতি এই ব্যাটারের বিদায়ে ১৫ ওভারে ৫ উইকেটে ৯৬ রানে পরিণত হয় বাংলাদেশ। সাত নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে শামীম হোসেন পাটোয়ারি ১৩ বলে ২৭ রানের ইনিংস খেলে বাংলাদেশের স্কোরকে ১৫০ রানের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। শেখ মেহেদীর সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ২৯ বলে ৪৯ রানের জুটি গড়তে অবদান রাখেন শামীম। ২০ ওভারে ৬ উইকেটে বাংলাদেশ থামে ১৪৭ রান করে। মেহেদী অপরাজিত থাকেন ২৬ রানে।