পুরান ঢাকার চকবাজারের অলিগলি যেন রাজনীতির এক চিরচেনা পাঠশালা। এই জনবহুল, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকার অলিগলিতে যখনই কোনো রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে, মিছিলের সম্মুখসারিতে যে কয়জন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর শোনা গেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম শাহিদা মোর্শেদ। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু, একের পর এক রাজনৈতিক মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক কিংবা রাজপথের টিয়ারশেল—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই নারী নেত্রীকে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক জনপ্রিয় এই কাউন্সিলর কেবল একজন জনপ্রতিনিধিই নন, বরং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কঠিন ও সংকটময় সময়ে রাজপথের এক বিশ্বস্ত সেনানী।
বর্তমানে চকবাজার থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাহিদা মোর্শেদ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত ‘দুর্দিনের কাণ্ডারি’ হিসেবে।
শাহিদা মোর্শেদের রাজনৈতিক জীবন কোনো সুযোগসন্ধানী বা হঠাৎ গড়ে ওঠা অধ্যায় নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থা রেখে রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু। পুরান ঢাকার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বলয়ে একজন নারী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু মেধা, সাহস ও ত্যাগের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে তৃণমূলের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেন।
ওয়ার্ড পর্যায় থেকে সক্রিয় হয়ে তিনি পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের সহ-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দল যখনই ডাক দিয়েছে, কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি পিছপা হননি। স্থানীয় চকবাজার থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তিনি রাজপথের প্রতিটি লড়াইয়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত রেখেছেন।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির ওপর দিয়ে যে চরম বৈরী ঝড় বয়ে গেছে, তার প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছেন শাহিদা মোর্শেদ। সভা-সমাবেশ পণ্ড হওয়া, নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং মধ্যরাতে বাসাবাড়িতে তল্লাশির মতো ভীতিকর পরিস্থিতিতেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। বহু সিনিয়র নেতা যখন আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হতেন, তখন চকবাজার ও লালবাগের অলিগলিতে ঝটিকা মিছিল বের করা এবং নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে শাহিদা মোর্শেদ ছিলেন অন্যতম ভরসাস্থল।
তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে একাধিক রাজনৈতিক মামলা। আদালতের বারান্দা থেকে শুরু করে রাজপথের উত্তপ্ত পিচ—সবখানেই তাঁর নিত্যদিনের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় এক যুবদল নেতা বলেন, “যখন অনেক পুরুষ কর্মীও গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকাছাড়া ছিলেন, তখন শাহিদা আপা আমাদের পরিবারগুলোর খোঁজ নিয়েছেন, আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন এবং রাজপথে নামার সাহস জুগিয়েছেন। দলের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সচরাচর দেখা যায় না।”
শাহিদা মোর্শেদ কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; জনগণের ভালোবাসায় তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। কাউন্সিলর থাকাকালে চকবাজার ও আশপাশের ঘিঞ্জি এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নারী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় তিনি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন।
বিরোধী দলের সমর্থিত কাউন্সিলর হওয়ায় নানা প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও বৈষম্যের মুখে পড়তে হলেও তিনি ওয়ার্ডবাসীর সেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর দরজা সবসময় খোলা থাকত। বিশেষ করে এলাকার নারীদের আত্মকর্মসংস্থান, সালিশ-বৈঠকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুঃসময়ে মানুষের দ্বারে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিতে তিনি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
চকবাজারের স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যবসায়ী জানান, “কাউন্সিলর হিসেবে শাহিদা মোর্শেদের কোনো অহংকার ছিল না। রাত-বিরাতে এলাকার মানুষ কোনো বিপদে পড়লে তাঁকেই আগে পাশে পাওয়া যেত। ক্ষমতার পালাবদলে অনেকেই বদলান, কিন্তু মানুষের প্রতি তাঁর আচরণ কখনো বদলায়নি।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়লেও মাঠের রাজনীতিতে এখনো নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। সেই প্রেক্ষাপটে শাহিদা মোর্শেদ পুরান ঢাকার নারীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন। গৃহবধূ থেকে শুরু করে তরুণী—সব বয়সের নারীদের তিনি সংগঠিত করেছেন এবং তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছেন।
তাঁর সহযোদ্ধারা জানান, বিএনপির মহাসমাবেশ কিংবা কর্মসূচিতে শাহিদা মোর্শেদের নেতৃত্বে নারী নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের উপস্থিতি সবসময়ই নজরে পড়ার মতো ছিল। রাজপথে পুলিশের জলকামান ও লাঠিচার্জের মুখেও তিনি কর্মীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন বহুবার।
রাজনীতিতে সুবিধাবাদী চরিত্রের ভিড়ে শাহিদা মোর্শেদ বরাবরই স্রোতের বিপরীতে হাঁটা এক দৃঢ়চেতা মানুষ। লোভ-লালসা কিংবা ভয়-ভীতি তাঁকে কখনো আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। দলের ভাঙাগড়া কিংবা বড় সংকটের মুহূর্তেও তিনি জিয়া পরিবারের প্রতি নিজের আনুগত্য ও দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিতে অবিচল থেকেছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, “শাহিদা মোর্শেদ আমাদের দলের সম্পদ। দলের সুদিনে অনেকেই পদ-পদবির জন্য সামনে আসেন, কিন্তু শাহিদা মোর্শেদের মতো মানুষেরা দলের রক্তক্ষরণের দিনে বুক পেতে দাঁড়ান। চকবাজার থানা ও মহানগর দক্ষিণে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত।”
রাজনীতির চলমান প্রেক্ষাপটে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এখনো সক্রিয় শাহিদা মোর্শেদ। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের ভালোবাসাই রাজনীতির আসল শক্তি।
ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও নিজের ভাবনা সম্পর্কে শাহিদা মোর্শেদ বলেন, “রাজনীতি আমার কাছে কোনো পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। শহীদ জিয়ার দর্শন ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন লড়াই আমাকে সবসময় শক্তি জুগিয়েছে। পুরান ঢাকার মানুষ আমাকে নিঃশর্ত ভালোবাসা দিয়েছেন, সেই ভালোবাসার ঋণ শোধ করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। পদ-পদবি বড় কথা নয়, দল ও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজপথে থেকে লড়াই করে যেতে চাই।”
চকবাজারের সংকীর্ণ গলিগুলোতে এখনো তাঁর পদচারণা প্রতিদিনের বাস্তবতা। হামলা-মামলার ক্ষত শরীরে বয়ে নিয়েও শাহিদা মোর্শেদ যেন পুরান ঢাকার রাজপথের এক অপরাজেয় নারী—যিনি প্রমাণ করেছেন, আদর্শে অবিচল থাকলে কোনো প্রতিকূলতাই রাজনীতির পথরোধ করতে পারে না।