• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম :
সিজারের নামে মরণফাঁদ: মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের ‘কসাইখানা’য় সাজানো মৃত্যুপুরী পাটগ্রামে ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪ শান্তি হারিয়ে গেছে সেই ভোজিনিয়ার জীবন থেকে ৩ বছরেও কেন বিয়ের ছবি প্রকাশ করেননি, জানালেন তাপসী পান্নু হাসপাতাল ছাড়লেন ‘রইছ’, কাটেনি শঙ্কা ভিডিও করায় তরুণকে মন্ত্রীর চড়, জবাব পেলেন তাৎক্ষণিক বন্যা ও ভূমিধসে ভারতে ৫৬, নেপালে ১৪ জনের মৃত্যু হাসনাতের ‘গণভিক্ষা কর্মসূচি’ নিয়ে হামিমের সমালোচনা চাঁদাবাজির বিকল্প হিসেবে ‘পুনর্বাসন দানবক্স’ চালুর ঘোষণা হাসনাত আবদুল্লাহর জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হাইকোর্টের রুল

সিজারের নামে মরণফাঁদ: মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের ‘কসাইখানা’য় সাজানো মৃত্যুপুরী

মোঃ শরিফুল ইসলাম রবিন | বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক / ২২ ভিজিটর
আপডেট : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সিজারের নামে মরণফাঁদ: মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের ‘কসাইখানা’য় সাজানো মৃত্যুপুরী

যেখানে একজন মানুষের জীবন রক্ষার কথা বলা হয়, সেখানে যদি জীবন নিয়ে খেলা করা হয় এবং চিকিৎসার নামে মরণফাঁদ পাতা হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানটি কি আদৌ হাসপাতাল? মিরপুরের পল্লবী এলাকায় অবস্থিত ‘মিরপুর জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নিয়ে এখন জনমনে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। জনশ্রুতি ও আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—যেখানে গর্ভবতী মায়েদের জীবন রক্ষা নয়, বরং তাদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল ‘সিজার’ বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনেই লক্ষ্যণীয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এই হাসপাতালটি এখন আর হাসপাতাল নয়, বরং একটি ‘কসাইখানা’র মতো করছে।

কমিশনের চক্করে সাজানো মরণফাঁদ
আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই হাসপাতালের চেয়ারম্যান আবু হানিফের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে টার্গেট করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিশেষ করে পল্লবীর আশেপাশে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তি এবং বিহারি ক্যাম্পগুলোতে এই হাসপাতালের একটি শক্তিশালী ‘দালাল চক্র’ সক্রিয় রয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই দালালরা কমিশনের লোভে পড়ে অসহায় ও অসচেতন মায়েদের কাছে গিয়ে সম্পর্ক তৈরি করে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে এবং আকর্ষনীয় ‘ডিসকাউন্ট’-এর প্রলোভন দেখিয়ে মায়েদের এই হাসপাতালে ভর্তি হতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রতিটি সফল ভর্তির বিপরীতে এই দালালরা মোটা অংকের কমিশন পায়। এই চক্রের জালে আটকা পড়ে যখন একজন মা হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তার স্বাভাবিক প্রসব (Normal Delivery) হওয়ার সুযোগ থাকলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সিজারের দিকে ঠেলে দেয়।

সিজারের নামে মরণফাঁদ: মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের ‘কসাইখানা’য় সাজানো মৃত্যুপুরী

তিনটি শাখা, একই চিত্র
মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ড কেবল মূল প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ নয়। এর তিনটি শাখা—কালশী শাখা, মিরপুর ১২ নম্বর শাখা এবং শিয়ালবাড়ি মোড় শাখা—সবগুলোতেই একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিটি শাখাতেই স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ কমিয়ে দিয়ে সিজারের হারকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। সিজার করার নামে রোগীদের কাছ থেকে ১৫ হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার বা তারও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বনাম ব্যবসায়িক লোভ: সিজার কেন ও কখন?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিজারিয়ান সেকশন (C-Section) বা সিজার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতি। তবে এটি একটি ‘জরুরি পদক্ষেপ’, কোনো ‘স্বাভাবিক পদ্ধতি’ নয়।

  • সিজার কেন করা হয়?
    সাধারণত যখন মা বা গর্ভস্থ শিশু—উভয়ের জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখনই চিকিৎসকরা সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। যেমন:
    ১. গর্ভস্থ শিশুর বিপন্নতা (Fetal Distress): যদি জরায়ুর ভেতর বাচ্চার হৃদস্পন্দন কমে যায় বা অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়।
    ২. ভ্রূণের অবস্থান (Malpresentation): বাচ্চা যদি উল্টো বা আড়াআড়িভাবে থাকে।
    ৩. প্লাসেন্টা প্রিভিয়া (Placenta Previa): গর্ভফুল যদি জরায়ুর নিচের দিকে বা জরায়ুমুখের কাছে থাকে, যা স্বাভাবিক প্রসবের সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি করে।
    ৪. প্রসবকালীন জটিলতা: জরায়ুমুখ পুরোপুরি না খুললে বা প্রসবের প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী ও বাধাগ্রস্ত হলে।

সিজারের ইতিহাস ও বিবর্তন:
প্রাচীনকালে সিজার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি কেবল মায়ের মৃত্যু নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসেবে দেখা হতো। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে অ্যানাস্থেসিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়লে এটি একটি নিরাপদ অস্ত্রোপচারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে, মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতিকে একটি ‘লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে’ রূপান্তর করেছে। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানেও সিজার করা হচ্ছে কেবল মুনাফা বৃদ্ধির জন্য। সিজারের অপব্যবহার ও মায়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অপ্রয়োজনীয় সিজার করা কেবল একটি অনৈতিক কাজ নয়, এটি একজন নারীর স্বাস্থ্যের ওপর স্থায়ী ও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, স্বাভাবিক প্রসবের বদলে জোরপূর্বক সিজার করলে মা পরবর্তীতে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন:

রক্তক্ষরণ ও ইনফেকশন: সিজারের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং অস্ত্রোপচারের স্থানে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
জরায়ুর ক্ষতি: বারবার বা অপ্রয়োজনীয় সিজারের ফলে জরায়ুর টিস্যু দুর্বল হয়ে যায়।

পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি: একজন মা যদি সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন, তবে তার পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ‘ইউটেরাইন রপচার’ বা জরায়ু ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা মা ও শিশু উভয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক ট্রমা: অহেতুক অস্ত্রোপচারের ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে।

দায় এড়াতে নীরবতা : মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে একের পর এক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলেও, প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও চেয়ারম্যানের প্রভাবের কারণে এসব ঘটনা বারবার ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের প্রভাব এতটাই বেশি যে আইনি প্রক্রিয়া বা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ খুব সহজেই স্তিমিত হয়ে যায়।

এই ভয়াবহ অভিযোগগুলো নিয়ে যখন আমরা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু হানিফকে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি, তিনি বারবার ফোন রিসিভ করতে অস্বীকার করেন। তার এই নীরবতা কি অপরাধের স্বীকারোক্তি? নাকি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সত্যকে চেপে রাখার কৌশল?

মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের এই অন্ধকার জগতের আরও গভীর রহস্য এবং ভুক্তভোগী মায়েদের আর্তনাদ নিয়ে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে আসছি।

আরও বিস্তারিত নিয়ে ফিরছি… (প্রথম পর্ব সমাপ্ত)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ