• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম :

গাইবান্ধায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, শহরে ১২ ও গ্রামে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

অনলাইন ডেস্ক / ৪ ভিজিটর
আপডেট : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
গাইবান্ধায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, শহরে ১২ ও গ্রামে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

দুপুর তখন ২টা। কাচারি বাজারের ফটোস্ট্যাট ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার সরকারের দোকানে মেশিন বন্ধ হয়ে যায় মাঝে-মধ্যে। ঘড়ি ধরে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার হিসাব তিনি এখন মুখস্থ বলতে পারেন- এক ঘণ্টা থাকলে পরের এক ঘণ্টা থাকে না। দিনে-রাতে মিলিয়ে অন্তত ১২ ঘণ্টা তার ঘরে ও দোকানে বিদ্যুৎ থাকছে না। দোকানের কাস্টমার ঘুরে যাচ্ছে ও ঘরের ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তার।

ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার সরকারের এই দুর্ভোগ তার একার নয়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গাইবান্ধার ৭ উপজেলার জনজীবন। শহরে তুলনামূলক কম, দিন-রাত মিলিয়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ- সেখানে ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষের ভোগান্তি যেন শেষই হচ্ছে না। স্থবির হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যও।

বিদ্যুৎ গ্রাহকসূত্রে জানা যায়, নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দেওয়া চাহিদা-সরবরাহের এই সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরও অনেক বেশি নাজুক। এ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধিও ভিন্ন। শহর এলাকায় সরবরাহ করে নেসকো, আর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরবরাহের দায়িত্বে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তবে, দুই ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে।

দিনের গরমের পর রাতেও রেহাই মিলছে না বাসিন্দাদের। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলা কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাওয়ার পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকছে। কখন বিদ্যুৎ যাবে ও কখন আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন গ্রাহকেরা। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক পরিবারকে ঘরের বাইরে, বারান্দায় কিংবা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এই ভোগান্তির সবচেয়ে বড় শিকার শিশু ও বয়স্করা।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে রাতের লোডশেডিংয়ে। আলো ও তীব্র গরমের কারণে পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে নিয়মিত পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী- কেউই স্বাভাবিকভাবে পড়তে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রামের যুবকরা বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছেন।

বিদ্যুৎ-নির্ভর ছোট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়েছে লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব। কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং প্রেস, অনলাইন সেবা, ছোট কারখানা- বিদ্যুৎ না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

নেসকো ও গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রাহকদের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ঘরের বিদ্যুৎ-নির্ভর যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম বারবার থমকে যাচ্ছে। এছাড়া, প্রচণ্ড গরমে ঘরে অবস্থান করাই কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ।

স্থানীয় শহরের ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, একদিকে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যেখানে সারা দিনে ৭শ টাকা আয় হতো সেখানে এখন ২শ টাকা রোজগার হচ্ছে না। খুব ভাগান্তিতে আছি। শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে ফটোকপি মেশিন ও কম্পিউটার নিয়ে। বিদ্যুৎ একবার গেলে আর আসার নাম নেয় না, আসলেও ১০ মিনিটের বেশি থাকে না।

এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ এর ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হওয়া সদরের বাসিন্দা লক্ষিপুরের ময়নুল ইসলাম বলেন, দিনে তো বিদ্যুৎ সারাদিন থাকেই না রাতে একবার বিদ্যুৎ গেলে আর আসে না। আসলেও ১০ মিনিটের বেশি সময় থাকে না। এতে ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ পড়েছে ভোগান্তিতে। কেউ রাস্তার ধারে শুয়ে রাত পার করে কেউ বা টঙে। আবার বিদ্যুৎহীন গ্রাম হওয়ায় অনেক যুবকরা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছেন।

অপরদিকে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে বর্তমান দৈনিক চাহিদা ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট হলেও গড়ে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি নিয়েই দিন পার করছে গ্রামীণ জনপদ।

গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নাম পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রকৃত চাহিদার দ্বিগুণ হলেও জ্বালানি সংকটে ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাধ্য হয়ে লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই লোড সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। বিভাগীয় ও জেলা শহরে অল্প লোডশেডিং দিয়ে, গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার সঞ্জীব কুমার রায় জানান, পাঁচ উপজেলায় আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকি। মোট সংযোগ লাইন সংখ্যা ৬৪-৬৫টি। গতকাল মঙ্গলবার থেকে এগুলোর গড়ে চাহিদা ছিল দিনে লোড ৬৪ মেগাওয়াট ও রাতে ৫৫ মেগাওয়াট। এই মোট গড়ে ৬৪ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল। তারমধ্যে এই পাঁচ উপজেলায় গড়ে দিনে-রাতে ১৭ থেকে ১৮ বার লোডশেডিং হয়েছে।

এদিকে জেলায় নেসকোর অধীনস্থ ফিডারগুলোর মোট চাহিদা ২০ থেকে ২৪ মেগাওয়াট, তবে দৈনিক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট। এরমধ্যে শুধু শহরের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট হলেও মিলছে সাড়ে আট থেকে নয় মেগাওয়াট।

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো-২) গাইবান্ধার কর্মকর্তা মো. আসিফ জানান, গরম বাড়লে লোডশেডিং একটু বৃদ্ধি পায়। গত রোববার থেকে লোডশেডিং গড়ে রাতে-দিনে ১২ বার করে হচ্ছে। বুধবার (১২ আগস্ট) দিনে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৭ বার লোডশেডিং হয়েছে। তার আশ্বাস, দু-একদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

তবে, এই আশ্বাস নতুন নয়। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এলএনজি টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরা এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গাইবান্ধাসহ দেশের প্রান্তিক জনপদগুলোর এই দুর্ভোগ কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ