রাজধানী ঢাকার পল্লবী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসিরের বিরুদ্ধে জাল ডিও লেটার ও ভুয়া রাজনৈতিক পরিচয় ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওসির দায়িত্ব থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আক্রোশ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তৈরি করা হয়েছে এসব ভুয়া কাগজপত্র। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসান বাসিরকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত করার অপচেষ্টা চালানো হলেও বাস্তবে তার পুরো পরিবার দীর্ঘ দিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে দাবি করা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এক সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে ওসি (তদন্ত) পদায়ন পান হাসান বাসির এবং তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।
তবে নথিপত্র ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত উক্ত চিঠিটি সম্পূর্ণ জাল ও মনগড়া। এতে কোনো স্মারক নম্বর নেই এবং ব্যবহৃত স্বাক্ষরটিও নকল। শিক্ষাগত যোগ্যতার নথিপত্র অনুযায়ী, হাসান বাসির জয়পুরহাট সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালে আইডিয়াল কলেজ থেকে প্রাইভেটে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নেন। আইন অনুযায়ী, প্রাইভেটে পরীক্ষা দেওয়া কোনো প্রার্থীর পক্ষে তৎকালীন নিয়মিত ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ ছিল না। এমনকি ২০০৭ সালে উক্ত কলেজে তার ছাত্রত্ব বা উপস্থিতি—কোনোটিরই অস্তিত্ব ছিল না। এছাড়া পুলিশ বিধিমালা অনুযায়ী, ওসি (তদন্ত) পদে পদায়নের জন্য কোনো রাজনৈতিক ডিও লেটারের প্রয়োজন পড়ে না।
অনুসন্ধানে ওসি হাসান বাসিরের পারিবারিকভাবে বিএনপিসমর্থিত রাজনীতির গভীর দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। তার আপন বড় ভাই আব্দুল ওহাব জয়পুরহাট জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির ৩ সদস্যবিশিষ্ট শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি পূর্বে জয়পুরহাট সরকারি কলেজের নির্বাচিত জিএস ছিলেন।
ওসি হাসান বাসিরের বড় ভাবি জয়পুরহাট জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বড় বোন জয়পুরহাট সরকারি কলেজে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে কমন রুম সম্পাদিকা নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া তার বড় ভগ্নিপতি আব্বাস আলী খান খেতলাল উপজেলা বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে হাসান বাসির ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তৎকালীন পুরো সময়ে তাকে কখনোই কোনো থানার ওসি হিসেবে পদায়ন দেওয়া হয়নি।
এমনকি ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিকভাবে ‘ভিন্ন মতাদর্শের পুলিশ কর্মকর্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার (উইথড্র) করা হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপপ্রচার চালিয়ে বৈষম্যবিরোধী ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চালানোকে চরম অন্যায্য ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হঠাৎ কেন এই অপপ্রচার—তার অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে উঠে আসে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও প্রতিহিংসার চিত্র। জানা গেছে, পল্লবী থানার সাবেক ওসি আলমগীর জাহান দায়িত্ব হস্তান্তরের পর থেকেই মনক্ষুণ্ণ ছিলেন। থানা হাতছাড়া হওয়ার পর তিনি ভুয়া প্যাড, জাল সিল ও ভুয়া স্বাক্ষর বানিয়ে বিভিন্ন মনগড়া কাগজপত্র তৈরি করেন। পরবর্তীতে এসব ভুয়া নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন গ্রুপ ও কিছু সংবাদকর্মীর কাছে ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান ওসির চরিত্র হননের চেষ্টা চালান।
ওসি হাসান বাসিরের বিরুদ্ধে অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া বা মিথ্যা মামলা সংক্রান্ত যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল, তার তদন্তেও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৫ তারিখ পল্লবী থানায় দায়ের হওয়া একটি অপহরণ মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) নিয়ম অনুযায়ী চিহ্নিত আসামিদের গ্রেফতার করেন। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল সেটিকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে প্রচার চালায়।
চলতি বছরের ১ মে রাজধানীর পল্লবী থানায় যোগদানের পূর্বে মো. হাসান বাসির রাজশাহী জেলার সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গোদাগাড়ী এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মাদক কারবারি, সীমান্ত অপরাধী ও স্থানীয় চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন।
গোদাগাড়ীর মতো অপরাধপ্রবণ ও মাদকপ্রবণ এলাকায় তিনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে হেরোইন ও মাদকের বড় বড় চালান জব্দ করেন। তালিকাভুক্ত মাদক সম্রাটদের আইনের আওতায় এনে এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। গোদাগাড়ীর সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজ তাকে একজন সৎ, নীতিবান ও অপরাধ দমনে আপসহীন কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, “আমাকে সামাজিক ও মানসিকভাবে হেয় করতেই জাল কাগজপত্র বানিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী মাঠে নেমেছে। আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্য ধানের শীষের রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং আমরা বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছি। গোদাগাড়ী থানায় যেভাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করেছি, পল্লবীতেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছি। অপপ্রচার চালিয়ে সত্যকে ঢাকা যাবে না, তদন্তেই সব বেরিয়ে আসবে।”