জন্মের পর দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকা তার। প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতিটি রাত কাটে যার পানির আতঙ্ক আর খাবারের চিন্তায়; তার পক্ষে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিজয় এক নীরব গল্প। নেই অন্য সহপাঠীদের মতো তার বিলাসিতার স্বপ্ন, তবে আছে অদম্য ইচ্ছে শক্তি। আর ইচ্ছেশক্তিকেই কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে চায় মেধাবী এক শিক্ষার্থী।
দারিদ্রতাকে জয় করার স্বপ্ন বুনতে চায় নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার মেধাবী শিক্ষার্থী মোছা. সাবিরা আক্তার। সে উপজেলার সীমান্তবর্তী বাসুদেবপুর গ্রামের ৩৩ নম্বর বাসুদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
সাবিরা আক্তার বাসুদেবপুর গ্রামের দিনমজুর দুলাল হোসেনের মেয়ে। মা সুম্মা বেগম গৃহিণী।
মা সুম্মা বেগম বলেন, অভাবের সংসার। মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েকে দিয়ে কিছু করাব। তার প্রবল পড়াশোনার ইচ্ছে শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হতে হয়। জানিনা এই অভাবকে জয় করে মেয়েকে কতদূর পড়াতে পারব।
স্থানীয় এক প্রতিবেশী ও শিক্ষক, সাবিরা আক্তার খুবই মেধাীব ও শান্ত স্বভাবের। নেই কোনো বায়না। তার শুধু একটাই স্বপ্ন পড়াশোনা করা। তার পড়ালেখায় প্রধান ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের দরিদ্রতা। আমরা চাই কোনো বাধাতেই যেন সাবিরার পড়াশোনা আটকে না থাকে।
শিক্ষক আরও বলেন, বাস্তবতা বড়ই কঠিন, খালি পেটে স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও বাস্তবতা বড়ই কঠিন ও নিষ্ঠুর। ভালো আহার, শান্ত পরিবেশ, পড়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা ছাড়া মেধাকে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। তবুও মেয়েটি লড়ছে। এই লড়াই চালিয়ে যেতে যে ইচ্ছাশক্তি লাগে তা অনেক সচ্ছল মানুষের মধ্যেও দেখা যায় না।
তিনি বলেন, কষ্টের বিষয় হলো, আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও তাকে যতটুকু সহায়তা দেওয়া উচিত, ততটা দিতে পারছি না। আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র তিনজন। অথচ আমার বাপ-দাদার সময়েও অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চার-পাঁচজন শিক্ষক ছিলেন। এত বছর পরও শিক্ষক সংখ্যা কার্যত বাড়েনি, অথচ দায়িত্ব ও শিক্ষার্থীর চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হুমায়ন কবির জানান, এই বিদ্যালয়ের মাত্র তিনজন শিক্ষক হলেও চলতি প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়নে সাবিরা আক্তার বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছে। পড়ালেখায় খুব ভালো শিক্ষার্থী হলেও তার পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এক পশলা ভারী বর্ষণেই বৃষ্টির পানি তার শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে ঠেকে। বন্যার আতঙ্ক, অভাব এসবই তার নিত্যসঙ্গী।
তিনি বলেন, ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস হলেও তার জ্ঞান অর্জনের দৌড় থেমে যায়নি। বৃষ্টি হলে ভিজেই আসতে হয় স্কুলে। কোনো কোনো দিন পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে মা সুম্মা বেগম তাকে বাড়িতে থাকতে বললেও মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে এ ক্ষুদে শিক্ষার্থী সাবিরা ছুটে আসে স্কুলে। কারণ সে বিশ্বাস করে শিক্ষাই তার জীবন বদলানোর একমাত্র পথ।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের হাজারো প্রত্যন্ত গ্রামের এমন অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, অনেক সময় তারা অর্থ ও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে, তবে মেধাবী শিক্ষার্থী সাবিরা আক্তারকে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হবে।
শিক্ষক স্বল্পতার সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক ডেপুটেশনের জন্য জেলায় তালিকা পাঠানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহেই শিক্ষক সংকট কেটে যাবে।’
ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী তাহমিনা সারমিন কালবেলাকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। তবে মেধাবী শিক্ষার্থী সাবিরা আক্তারের কথা শুনেছি। উপজেলা পরিষদ থেকে তার জন্য কিছু করার ব্যবস্থা করা হবে।