• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

যুদ্ধবিরতি নাকি প্রতারণার ছক— ট্রাম্প আসলে কী চান?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৪ ভিজিটর
আপডেট : রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
যুদ্ধবিরতি নাকি প্রতারণার ছক— ট্রাম্প আসলে কী চান?

উত্থান-পতনে ভরা তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সংঘাত, গভীর অবিশ্বাস এবং সংলাপের কোনো সুস্পষ্ট সম্ভাবনার অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। এখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ওয়াশিংটন কি সত্যিই ইরানের সঙ্গে চলমান এই সংকটের ইতি টানতে চাইছে, নাকি তারা আবারও কূটনীতিকে কেবল চাপ প্রয়োগের কৌশলের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে?

ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের শুরুতে ‘গুপ্তচরদের আস্তানা’ (তেহরানের মার্কিন দূতাবাস) দখলের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক সংকট, অসমাপ্ত আলোচনা, নিষেধাজ্ঞা, পালটাপালটি হুমকি এবং পরোক্ষ সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির কারণে এই বৈরী সম্পর্ক সাময়িকভাবে সংলাপের পথে এগোলেও, ২০১৮ সালে চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতিতে ফিরে আসার কারণে উভয় পক্ষের আস্থার ভঙ্গুর ভিত্তিটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান চুক্তির সম্ভাবনা এবং কঠোর সামরিক হামলার হুমকির মধ্যে দুলছে। কারণ, তারা কূটনীতিকে চাপ প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভরশীল একটি হাতিয়ারে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ইরান জোর দিয়ে বলছে যে, তারা সরাসরি আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনো অনুরোধ করেনি। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও তেহরান সন্দিহান।

মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার বিস্তৃতি, ইরাকে প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে সৌদি আরবের আরও প্রকাশ্য উপস্থিতি, লোহিত সাগরে উত্তেজনা এবং এই সংকটে মিসরের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ইঙ্গিত দেয় যে—তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরোধ এখন আর নিছক দ্বিপক্ষীয় সংঘাত নয়, এর প্রভাব পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যয়, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি মার্কিন অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য লক্ষ্য অর্জনে হোয়াইট হাউসের হাতে থাকা হাতিয়ারগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

জোরপূর্বক কূটনীতির ধারাবাহিকতা

ইরান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তিনি কূটনীতিকে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে কোনো স্থিতিশীল ও টেকসই পথ হিসেবে দেখেন না; বরং সামরিক চাপের পাশাপাশি একে একটি সাময়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট এখনো তেহরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা বলছেন এবং আলোচনা থেকে ফল আসতে পারে বলে জোর দিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলার কঠোর হুমকি দিচ্ছেন এবং প্রকাশ্যেই বলছেন যে, ইরানি কর্মকর্তাদের ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন।

তেহরানের প্রতিনিধিদের আলোচনার ধরন নিয়েও তিনি সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, ইরানিরা এমন সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, যা তার মতে খুব কম সময়েই সমাধান করা সম্ভব। এসব বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, প্রচলিত অর্থে কূটনীতির প্রতি ট্রাম্পের খুব একটা দায়বদ্ধতা নেই। তিনি কেবল তখনই আলোচনা মেনে নেন, যখন তা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী দ্রুত ও অনুকূল ফলাফল বয়ে আনে। বস্তুত, এই অবস্থানগুলোর মাধ্যমে এটা বোঝা যায় যে ট্রাম্পের কাছে কূটনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ হলো দুটি পরিপূরক হাতিয়ার। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই হাতিয়ারগুলো চাপ বাড়াতে, ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করতে এবং ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রূপরেখা চাপিয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্য ঢেলে সাজানোর প্রকল্প

ইরানের প্রতি ট্রাম্পের নীতিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সংলাপ এবং চুক্তির প্রস্তাব মানেই যে ওয়াশিংটন মতবিরোধের স্থায়ী সমাধান চায়, বিষয়টি তেমন নয়। বরং এটি হতে পারে এই অঞ্চলে একটি নতুন ভারসাম্য চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ। এই মডেলে, আলোচনা মূলত প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলার সুযোগ তৈরি করে; সেইসঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে গিয়েও নতুন নতুন দাবি উত্থাপন করা হয়।

ফলে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানো বা বন্ধ করার মতো নির্দিষ্ট কোনো ছাড় মেনে নেওয়াটাই সংঘাত অবসানের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচিত হয় না। কারণ, তখন দাবির পরিধি বাড়িয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পররাষ্ট্রনীতির গতিপথকেও এর আওতায় আনা হতে পারে। পারমাণবিক চুক্তির ভারসাম্যহীন বাস্তবায়নের ইতিহাস এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে যে, ইরান যে পরিমাণ ছাড় দেবে, তার অনুপাতে হয়তো অন্য পক্ষ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। এমন পরিস্থিতির ফলস্বরূপ কূটনীতিকে অকেজো মনে করা উচিত নয়, বরং একে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আলোচনা হতে হবে ক্ষমতার ভারসাম্য, যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধ সক্ষমতার ভিত্তিতে। অন্যথায়, সংলাপ হয়তো দেশের সক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় করার এবং পরবর্তী চাপের প্রেক্ষাপট তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

ইরান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত এমন একটি চুক্তি অর্জন করা, যা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে সংলাপে ফেরার পথ সুগম করবে। একই সঙ্গে, ‘ভয়াবহ সামরিক পদক্ষেপে’ ফিরে যাওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বজায় রেখে তিনি ইরান ও মধ্যস্থতাকারীদের আমেরিকার কাঙ্ক্ষিত রূপরেখা মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন। এই সমীকরণে, হামলা বন্ধ রাখার অর্থ সামরিক বিকল্প থেকে সরে আসা নয়, বরং আলোচনার পথ যাচাই করতে তা সাময়িক স্থগিত রাখা। এখানে কূটনীতিকে কোনো স্বাধীন লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং দ্রুত একটি বাস্তবিক ফলাফলে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। অতএব, উল্লেখিত অবস্থানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সংঘাত বৃদ্ধির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখতে ট্রাম্প সামরিক চাপ এবং সংলাপের মধ্যে বারবার কৌশল বদলাচ্ছেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ দৃশ্যত থেমে গেছে, তবে এটি এমন এক অবস্থায় বিরাজ করছে যেখানে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, প্রতিশ্রুতির সীমা নিয়ে মতবিরোধ এবং সামরিক ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কূটনীতিকে জুড়ে দেওয়ার কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত অবস্থানগুলো প্রমাণ করে যে, আলোচনার সম্ভাবনার প্রস্তাব এবং সামরিক অভিযান জোরদার করার হুমকি—দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ধরনের কৌশল সংলাপের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থার পরিবেশকে দুর্বল করে দেয় এবং উভয় পক্ষের নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার ওপর তেহরানের জোর এবং প্রয়োগ ও যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে—প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও বিরোধ নিষ্পত্তির স্পষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া যেকোনো নতুন সংলাপ মারাত্মক বাধার মুখে পড়বে।

একই সময়ে ইরাক, লোহিত সাগর, জর্ডান এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য অংশে উত্তেজনার বিস্তার এই ইস্যুটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্তর থেকে ছাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়ে পরিণত করেছে। সামরিক অভিযানের মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি, প্রতিরক্ষা মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার উদ্বেগ এবং তেলের দামের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে। এরপরও, আলোচনা তখনই উত্তেজনা টেকসইভাবে কমাতে ভূমিকা রাখতে পারবে, যখন এটি তাৎক্ষণিক চাপ প্রয়োগের যুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে এবং পারস্পরিক স্বার্থ, সুনির্দিষ্ট সময়সূচি, বাস্তবিক নিশ্চয়তা ও ধারাবাহিক যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।

সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ